
মো: হাসান আলী রেজা (দোজা)
চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস আজ বিশ্বরাজনীতিতে একধরনের অপরাধে পরিণত হয়েছে। সংলাপ নয়, এখন গ্রহণযোগ্য ভাষা হলো শক্তির ভাষা-যেখানে কথার ওজন নির্ধারিত হয় অস্ত্র, অর্থনীতি ও জোটের হিসাব দিয়ে। এই বাস্তবতা শুধু দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রতিধ্বনি স্পষ্টভাবে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নীতি-নির্ধারণী টেবিলেও।
ভেনেজুয়েলার মাদুরো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চেয়েছিলেন-তা অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ইউক্রেনের জেলেনস্কি একই সাহস দেখাতে পারছেন-কারণ তাঁর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট। ইরান আলোচনায় টিকে থাকতে মরিয়া-কারণ আলোচনার বাইরে থাকাই আজ সবচেয়ে বড় শাস্তি। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় নৈতিকতার জায়গা সংকুচিত; কার্যকারিতাই শেষ কথা।
এই বাস্তবতা আমাদের জন্যও নতুন নয়। বাংলাদেশ বহুবার দেখেছে-কোন বিষয়টি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ হবে, আর কোন বিষয়টি ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে উপেক্ষিত থাকবে, তা নির্ধারিত হয় শক্তির সমীকরণে। এখানে মানবাধিকার, গণতন্ত্র কিংবা আইনের শাসন-সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলোর গুরুত্ব সক্রিয় হয় নির্দিষ্ট সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী।
সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি কিংবা নরিয়েগা-এই নামগুলো আমাদের জন্য দূরের ইতিহাস মনে হলেও শিক্ষা খুব কাছের। একসময় তারা ছিলেন প্রয়োজনীয় মিত্র, পরে হয়ে উঠেছেন অপ্রয়োজনীয় বোঝা। তখনই তাদের নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ‘স্বৈরাচার’ তকমা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-ক্ষমতা ফুরোলেই নৈতিকতা জেগে ওঠে।
বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতাই নির্ধারণ করে কে বৈধ, কে অবৈধ। কোন দেশের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য, কোন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ-এসব মূল্যায়ন অনেক সময় অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার চেয়ে বহির্বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক আইন এখানে চূড়ান্ত সত্য নয়; প্রয়োজন ভিত্তিক ব্যাখ্যার দলিল মাত্র ।
জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোর ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণও বহুবার পর্যবেক্ষণ করেছে। বিবৃতি আসে, উদ্বেগ জানানো হয়, পর্যবেক্ষণ দল আসে-কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকে সীমিত। বিশ্ববিবেকের এই সীমাবদ্ধতা আমাদের শেখায়-নিজস্ব সক্ষমতা ও কৌশল ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়।
একসময় শাসকেরা ভয় পেতেন-জনগণ, বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে। আজ ভয় পাল্টে গেছে। আধুনিক রাষ্ট্রে ধ্বংস আসে নীরবে-ঋণের চাপে, বাজারের সংকেতে, নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিতে। যুদ্ধ ঘোষণা লাগে না; একটি রেটিং পরিবর্তন, একটি বিবৃতি কিংবা একটি কূটনৈতিক দূরত্বই যথেষ্ট।
নতুন বৈশ্বিক বন্দোবস্তে শৃঙ্খলা এসেছে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা সমান নয়। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিয়মকে প্রয়োজন মতো বাঁকাতে পারে, আর দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে নিয়মের ভার বইতে হয় পুরোটা। বাংলাদেশও এই বৈপরীত্যের ভেতর দিয়েই এগোচ্ছে-একদিকে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চাপ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো-আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি? চোখে চোখ রেখে, না চোখ নামিয়ে? জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নামে নীরবতা কখন কৌশল, আর কখন আত্মসমর্পণ-সে বিভাজন রেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সভ্যতার চাকা ঘুরছে-কিন্তু সামনে নয়, একধরনের নিয়ন্ত্রিত বৃত্তে। নাম বদলায়, কাঠামো বদলায়, উন্নয়নের ভাষা বদলায়-কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র একই থাকে। এই বৃত্তের ভেতরে বাংলাদেশকে হাঁটতে হচ্ছে সতর্ক পায়ে, কারণ সামান্য ভুল পদক্ষেপের মূল্য দিতে হয় বহু বছর ধরে।
প্রশ্নটি তাই কে স্বৈরাচার-কে স্বৈরাচার নয়।
প্রশ্নটি হলো-এই বৈশ্বিক ব্যবস্থায় কে প্রয়োজনীয়, আর কে কেবল সহনীয়।
চোখে চোখ রেখে কথা বলার অধিকার যদি কেবল শক্তিশালীদের জন্য সংরক্ষিত হয়, তবে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য সভ্যতার এই অগ্রযাত্রা আশ্বস্ত করে না। কারণ যে সভ্যতায় নীরবতা টিকে থাকার শর্ত হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- নীরবতার অভ্যাসকে কৌশল ভেবে স্থায়ী করে না ফেলা। কারণ ইতিহাস বলে, নীরবতা সবসময় নিরাপত্তা দেয় না; অনেক সময় তা ভবিষ্যতের দায় হয়ে ফিরে আসে।
সভ্যতার অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন চোখে চোখ রেখে কথা বলার অধিকার কেবল শক্তির নয়, ন্যায়েরও হয়।
সেই দিনটি আসবে কি না-তার উত্তর এখনো আমাদের সামনে খোলা প্রশ্ন হয়েই রয়ে গিয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী