
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি শব্দ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—নতুন রাজনীতি। এই শব্দের বাহক হিসেবে সামনে এসেছে এনসিপি (NCP)। তারা নিজেদের উপস্থাপন করছে প্রচলিত দলগুলোর বাইরে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিকল্প কি সত্যিই তৃণমূলের, নাকি এটি আরেকটি এলিট প্রকল্প? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এলিটিজমের রাজনৈতিক চরিত্র এলিটিজম মানে কেবল ধনসম্পদ বা সামাজিক অবস্থান নয়। রাজনীতিতে এলিটিজমের অর্থ হলো—
ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত ও ভাষা এমন একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা, যারা মনে করে “আমরাই ভালো জানি, জনগণ শুধু অনুসরণ করবে।”
এনসিপির রাজনীতিতে এই প্রবণতা স্পষ্ট।
তাদের বক্তব্য, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—নেতৃত্ব আসে মূলত শহুরে, ইংরেজিভাষী, মিডিয়া–ঘনিষ্ঠ একটি বৃত্ত থেকে মাঠের রাজনীতির চেয়ে প্রাধান্য পায় সেমিনার, টকশো ও ডিজিটাল অ্যাক্টিভিজম তৃণমূল কর্মীর বদলে মুখ্য হয়ে ওঠে “কনসালট্যান্ট”, “স্ট্র্যাটেজিস্ট” ও “পলিসি ব্রিফ” রাজনীতি এখানে গণমানুষের সংগ্রাম নয়—বরং একটি ম্যানেজড ডিসকোর্স।
তৃণমূল রাজনীতি: কাগজে নয়, পথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে—যে রাজনীতি জনগণের আবেগ, কষ্ট ও দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত নয়, সে রাজনীতি টেকসই হয় না।
তৃণমূল রাজনীতি মানে—পাড়া–মহল্লার সমস্যা নিয়ে লড়াই থানা–ওয়ার্ডে সংগঠন গড়ে তোলা দমন–নিপীড়নের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থাকা
ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের পাশে দাঁড়ানো এনসিপির রাজনীতিতে এই তৃণমূল সংগ্রামের চিহ্ন অত্যন্ত দুর্বল।
তারা কথা বলে জনগণের নামে, কিন্তু জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসে না।
“আমরাই জানি”—এই বিপজ্জনক ধারণা এনসিপির সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের ভাষা। তাদের বক্তব্যে একটি সুস্পষ্ট উপদেশমূলক সুর আছে—যেন জনগণ ভুল করছে, আর তারাই ঠিক পথ দেখাবে। এই মনোভাবই এলিটিজমের মূল। গণতন্ত্রে নেতৃত্ব মানে জনগণের উপরে দাঁড়ানো নয়,
জনগণের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু এনসিপির রাজনীতিতে জনগণ অনেক সময় audience, actor নয়।
বাস্তবতা বনাম ভাবমূর্তি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপি যতটা শক্তিশালী, মাঠের রাজনীতিতে তারা ততটাই দুর্বল।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সূচক।
বাংলাদেশে ভোট হয় কেন্দ্রে, রাজনীতি গড়ে ওঠে পাড়ায়, ক্ষমতা নির্ধারিত হয় সংগঠনে।
এই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ না খেলে কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না।
শেষাংশ:
বাংলাদেশ আজ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল ক্ষমতার সংকট নয়— এটি প্রতিনিধিত্বের সংকট। এই সংকট এলিটিজম দিয়ে সমাধান করা যায় না। সমাধান আসে তৃণমূল থেকে উঠে আসা, সংগ্রামে পরীক্ষিত, জনগণের ভাষায় কথা বলা নেতৃত্ব থেকে।
নতুন রাজনীতি মানে নতুন মুখ নয়— নতুন সম্পর্ক, নতুন দায়বদ্ধতা, নতুন শিকড়।
এনসিপি যদি সত্যিই বিকল্প হতে চায়, তাহলে তাদের প্রথম কাজ হবে নিজেদের এলিট বৃত্ত ভাঙা এবং রাজনীতিকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। নচেৎ, এনসিপি আর পাঁচটি “ভালো বলা কিন্তু কম চলা” রাজনৈতিক পরীক্ষার নাম হয়েই ইতিহাসে যুক্ত হবে।