
ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার যুগে ডাটা সেন্টার কোনো বিলাসী অবকাঠামো নয়—বরং এটি একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) টিয়ার–৩ ও টিয়ার–৪ ডাটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা করছে—এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসার যোগ্য। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কেবল নতুন অবকাঠামো নির্মাণের দিকেই এগোচ্ছে, নাকি বিদ্যমান সক্ষমতা ও বাস্তব চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে একটি টেকসই ডাটা ইকোসিস্টেম গড়ার পথে হাঁটছে?
বিদ্যমান ডাটা সেন্টার: সক্ষমতা আছে, ব্যবহারে ঘাটতি
বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি ও আধা-সরকারি পর্যায়ে একাধিক ডাটা সেন্টার বিদ্যমান। জাতীয় ডাটা সেন্টারসহ বিভিন্ন আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলা হলেও বাস্তবতা হলো—এই ডাটা সেন্টারগুলোর ব্যবহার হার অত্যন্ত কম। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দপ্তরগুলো এখনও নিজস্ব সার্ভার, বিদেশি ক্লাউড বা অপ্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের ওপর নির্ভরশীল।
এর প্রধান কারণগুলো হলো—
পেশাদার ডাটা সেন্টার ম্যানেজমেন্টের অভাব
বেসরকারি খাত ও স্টার্টআপদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্য কাঠামোর অনুপস্থিতি, সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (SLA), আপটাইম গ্যারান্টি ও সাইবার সিকিউরিটির ওপর আস্থার ঘাটতি, নীতিগত অস্পষ্টতা ও টেকনোক্রেটিক জটিলতা । ফলে অবকাঠামো থাকলেও তা ডিজিটাল অর্থনীতির গতি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
টিয়ার–৩ ও টিয়ার–৪ ডাটা সেন্টার: কেন প্রয়োজন
এখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে টিয়ার–৩ ও টিয়ার–৪ মানের ডাটা সেন্টার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে—
জাতীয় তথ্য নিরাপত্তা ও ডাটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ফিনটেক, হেলথটেক, এডটেক ও ই-গভর্ন্যান্সের মতো সংবেদনশীল খাতের জন্য স্থানীয় স্টার্টআপ ও আইসিটি ফার্মগুলোকে বিদেশি ক্লাউড নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং আঞ্চলিক ডাটা হাব হওয়ার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তবে এই প্রয়োজনীয়তা বাস্তবায়নের আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জরুরি—বাস্তব চাহিদা কতটুকু এবং বর্তমান অবকাঠামো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে?
চ্যালেঞ্জ: অবকাঠামোর চেয়ে শাসন ও ব্যবস্থাপনা বড় সমস্যা
বাংলাদেশের ডাটা সেন্টার খাতে মূল সংকট অবকাঠামোর অভাব নয়, বরং গভর্ন্যান্স ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ডাটা সেন্টার সফল হয় তখনই, যখন— তা রাজনৈতিক নয়, পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়
বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব (PPP) গড়ে ওঠে
বাজারভিত্তিক চাহিদা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা করা হয়
শুধু নতুন ভবন ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেই টিয়ার–৩ বা টিয়ার–৪ ডাটা সেন্টার কার্যকর হয় না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক মানের অপারেশনাল স্ট্যান্ডার্ড এবং স্বচ্ছ নীতিকাঠামো।
নীতিগত করণীয়: ধাপে ধাপে, তথ্যভিত্তিক অগ্রযাত্রা
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে কয়েকটি সুস্পষ্ট সুপারিশ সামনে আসে— বিদ্যমান ডাটা সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ অডিট ও ব্যবহার বিশ্লেষণ বর্তমান সক্ষমতা, ব্যবহার হার, ব্যর্থতার কারণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা জরুরি।
আইসিটি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডাস্ট্রি স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শ কেবল আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়—স্টার্টআপ, টেলিকম, ব্যাংকিং ও সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করতে হবে।
বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ
একসঙ্গে বড় প্রকল্পে না গিয়ে অঞ্চলভিত্তিক ও খাতভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী ডাটা সেন্টার সম্প্রসারণ করা যুক্তিযুক্ত।
পেশাদার ও স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো
ডাটা সেন্টারকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে এনে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনায় দিতে হবে।
উপসংহার
বিএনপির টিয়ার–৩ ও টিয়ার–৪ ডাটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি দূরদর্শী উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগ সফল হবে তখনই, যখন তা কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডাটা গভর্ন্যান্স, দক্ষতা ও বাস্তব চাহিদার সমন্বিত রোডম্যাপে রূপ নেবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নয়—বরং একটি ডাটা-সার্বভৌম, দক্ষ ও টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গড়তে হলে এখনই তথ্যভিত্তিক ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
প্রধান সম্পাদক : মোঃ এহছানুল হক ভূঁইয়া, প্রকাশক : মোঃ হাসান আলী রেজা (দোজা)
সম্পাদক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
সম্পাদকীয় কার্যালয়: টেক্সাস, ইউ. এস. এ, ফোন : +𝟏 (𝟗𝟕𝟐) 𝟐𝟎𝟏-𝟖𝟔𝟗𝟒
বাংলাদেশ অফিস : ৩৪০/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪।
বাংলাদেশ যোগাযোগ : +88-01511461475, +88-01911804581