
১. জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক অসংগতি
বৃটেন, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বহু বাংলাদেশি দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী। অনেকে বাস্তব ও প্রায়োগিক (practical) প্রয়োজনে দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও তারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
তবে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা জাতীয় সংসদের সদস্য হতে পারবেন না। এখানেই সাংবিধানিক বৈষম্য স্পষ্ট। কারণ—
দ্বৈত নাগরিকরা প্রতিমন্ত্রী বা মন্ত্রী মর্যাদার মেয়র হতে পারেন,
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, এমনকি প্রধান বিচারপতিও হতে পারেন (উল্লেখ্য, সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি দ্বৈত নাগরিক ছিলেন),
কিন্তু সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের জন্য নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এই বৈষম্যের কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই। গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটেনে দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ সদস্য হতে পারেন। এমনকি বৃটেনে এমপি হতে হলে বৃটিশ নাগরিক হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়—বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট নিয়েও সেখানে সেটেল্ড কেউ ব্রিটিশ এমপি হতে পারেন।
সুতরাং জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক যারা পরবর্তীতে দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের জন্য সংবিধানের বৈষম্যমূলক ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করা সময়ের দাবি।
২. নির্বাচন করার সুযোগ অন্তত নিশ্চিত করা হোক
ন্যূনতমভাবে হলেও দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। একটি যৌক্তিক ব্যবস্থা হতে পারে— নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি থাকবে, কিন্তু নির্বাচিত হলে শপথ গ্রহণের পূর্বে বিজয়ী প্রার্থীকে অন্য নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে।
এতে রাষ্ট্রের আনুগত্যের প্রশ্নও থাকবে না, আবার গণতান্ত্রিক অধিকারও খর্ব হবে না।
অন্যথায় বিজয়ী না হলে তার “আমও যাবে, ছালাও যাবে”—এমন অযৌক্তিক শাস্তি কেন?
একজন ব্যক্তি যদি তিনটি আসনে (অতীতে পাঁচটি আসনে) নির্বাচন করতে পারেন এবং বিজয়ী হওয়ার পর একটি রেখে বাকিগুলো ছেড়ে দিতে পারেন, তাহলে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে শুধু প্রার্থী হওয়াকেই কেন নিষিদ্ধ করা হবে?
কিছু মানুষ যুক্তি দেন—দ্বৈত নাগরিকরা বিদেশে থাকেন, ভোটাররা সময়মতো তাদের পাবেন না। কিন্তু এর উত্তর খুব সহজ: Let the voters decide.
ভোটাররা যদি মনে করেন প্রার্থী তাদের জন্য উপযুক্ত নন, তারা ভোট দেবেন না। কিন্তু কৃত্রিম (artificial) বাধা তৈরি করে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিককে আটকিয়ে রাখার কোনো গণতান্ত্রিক যুক্তি নেই।
৩. আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশ
বর্তমান কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তিন দেশের নাগরিক—কানাডিয়ান, ব্রিটিশ ও আইরিশ। যদি তিনি আধুনিক রাষ্ট্র কানাডার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সংসদ সদস্য হওয়ার পথে দ্বৈত নাগরিকত্বকে অজুহাত বানানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না।
৪. দ্বৈত নাগরিকের ধরন ও রাষ্ট্রের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি
সব দ্বৈত নাগরিক এক রকম নন।
একদিকে আছেন সেইসব জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক—
যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন,
নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন,
বাস্তব প্রয়োজনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন,
কিন্তু বাংলাদেশকে দেওয়ার জন্য আগ্রহী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অন্যদিকে আছেন সেইসব বাংলাদেশি চোর-ডাকাত—
যারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে,
অর্থের বিনিময়ে বিদেশি নাগরিকত্ব কিনে নিয়েছেন।
এই দুই শ্রেণির মধ্যে আকাশ–পাতাল পার্থক্য। কিন্তু রাষ্ট্র সঠিকভাবে পার্থক্য না করে তথাকথিত “আনুগত্যের” ধোঁয়া তুলে প্রকৃত মেধাবী, চৌকস ও দেশপ্রেমিক দ্বৈত নাগরিকদের জন্য সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে।
এই প্রতিবন্ধকতা না থাকলে বাংলাদেশ মার্ক কার্নির মতো স্মার্ট, যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের নেতৃত্ব পেতে পারত।
সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়—এটি সময়ের সঙ্গে সংশোধনযোগ্য একটি সামাজিক চুক্তি।
দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রশ্নে বৈষম্য দূর করা এখন শুধু প্রয়োজন নয়, একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।
প্রধান সম্পাদক : মোঃ এহছানুল হক ভূঁইয়া, প্রকাশক : মোঃ হাসান আলী রেজা (দোজা)
সম্পাদক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
সম্পাদকীয় কার্যালয়: টেক্সাস, ইউ. এস. এ, ফোন : +𝟏 (𝟗𝟕𝟐) 𝟐𝟎𝟏-𝟖𝟔𝟗𝟒
বাংলাদেশ অফিস : ৩৪০/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪।
বাংলাদেশ যোগাযোগ : +88-01511461475, +88-01911804581