
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো নিছক ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় আচরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ইঙ্গিত বহন করে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদের সরাসরি বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে দলটির সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক তেমনই একটি ঘটনা।
এটি শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রথা ভাঙার তাৎপর্য
বাংলাদেশে কর্মরত গোয়েন্দা বা সামরিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ নতুন নয়। তবে সেই যোগাযোগ সাধারণত ঘটে নীরবতায়—ব্যক্তিগত বাসভবন, রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা বা নিরপেক্ষ স্থানে। কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের বৈঠক নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এনএসআই একটি সংবিধানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, যার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত গোয়েন্দা কার্যক্রম। সেই সংস্থার প্রধানের প্রকাশ্যভাবে একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়া প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে।
প্রেক্ষাপট ও সময়ের ইঙ্গিত
এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন, সদ্য বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, এবং দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়কাল চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ স্বাভাবিক কূটনৈতিক বাস্তবতা নাকি ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণে অবস্থান নির্ধারণের প্রচেষ্টা—সে প্রশ্ন এড়ানো যাচ্ছে না।
সামরিক শিষ্টাচার ও প্রটোকলের বিতর্ক
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন ঘিরে সেনাবাহিনীর প্রটোকল সংক্রান্ত ঘটনাগুলো এই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় সেনা কন্টিনজেন্টের উপস্থিতি এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সামরিক মহলে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা নিছক আনুষ্ঠানিক নয়—এটি শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রীয় কোনো নির্বাহী বা সাংবিধানিক পদে আসীন নন, তখন তাঁর ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত প্রটোকল ভবিষ্যতে বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
রাষ্ট্র বনাম দল: সীমারেখা কোথায়?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল শক্তিশালী হবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। গোয়েন্দা ও সামরিক সংস্থার নিরপেক্ষতা শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রধান স্তম্ভ।
এনএসআই প্রধানের এই বৈঠক যদি কেবল শোক প্রকাশ বা সৌজন্য বিনিময় হয়, তবে সেটি আরও সংযত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ছিল। আর যদি এর পেছনে রাজনৈতিক সমন্বয় বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গভীর আলোচনা থাকে, তবে সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শেষ কথা,
বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি পদক্ষেপ বাড়তি গুরুত্ব বহন করে। প্রথা ভাঙা কখনো কখনো ইতিহাস বদলায়, কিন্তু প্রথাহীনতা যদি শৃঙ্খলা ভাঙে—তবে তার মূল্য রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।
গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব। সেই জায়গা থেকে একচুল সরে এলেই প্রশ্ন উঠবে—আর সেই প্রশ্নই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
প্রধান সম্পাদক : মোঃ এহছানুল হক ভূঁইয়া, প্রকাশক : মোঃ হাসান আলী রেজা (দোজা)
সম্পাদক : মোহাম্মদ মনির হোসেন কাজী
সম্পাদকীয় কার্যালয়: টেক্সাস, ইউ. এস. এ, ফোন : +𝟏 (𝟗𝟕𝟐) 𝟐𝟎𝟏-𝟖𝟔𝟗𝟒
বাংলাদেশ অফিস : ৩৪০/এ, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪।
বাংলাদেশ যোগাযোগ : +88-01511461475, +88-01911804581