
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু পরিবার কেবল “নাম” নয়—তারা একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। ‘জিয়া পরিবার’ও তেমনই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু—যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিএনপি সূত্রে নিশ্চিতভাবে প্রচারিত—একটি যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছে, একই সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্ব-ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এই পটভূমিতে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক দৃশ্যমানতা—বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফোরাম, দলীয় সভা, কূটনৈতিক সমবেদনা পর্ব, এবং কবরস্থানে পরিবারের সঙ্গে মোনাজাতে অংশগ্রহণ—তাকে “সম্ভাবনার তালিকা” থেকে বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্নটা আবেগের নয়—রাজনীতিতে ‘অভিষেক’ সত্যিই কি সময়ের অনিবার্য দাবি, নাকি কৌশলগত প্রস্তুতির ধারাবাহিক ফল?
১) শিক্ষাগত যোগ্যতা: ‘ক্যাডার’ নয়, ‘ক্রেডেনশিয়াল’—প্রজন্মের নতুন টাইপ
জাইমা রহমানের ক্ষেত্রে প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে—তিনি আদর্শ দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার-চিত্রের মতো “মাঠ থেকে উঠে আসা” কোনো কর্মী নন। বরং দীর্ঘ প্রবাসজীবন ও আইন-প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা এক পেশাগত প্রোফাইল।
গণমাধ্যম প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ‘বার অ্যাট ল’ অর্জন করে ব্যারিস্টার হিসেবে পরিচিত হন—এই পরিচয় তাকে রাজনৈতিক আলোচনা টেবিলে “যোগ্যতা-ভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা” যোগায়।
পর্যবেক্ষক মহলের পর্যবেক্ষণ:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবার-উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিতর্ক থাকে, সেখানে “শিক্ষা/পেশাগত সক্ষমতা” এক ধরনের ঢাল। মাঠে না থাকলেও ‘পলিসি’ ও ‘আইন’—দুই পরিসরে কথা বলার যোগ্যতা নতুন প্রজন্মের নেতাদের একটি বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে। জাইমা এই মডেলেই বেশি মানানসই।
২) খালেদা জিয়ার সংস্পর্শ: উত্তরাধিকার শুধু রক্তের নয়—রাজনীতির ‘মেমোরি’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্ব—চিকিৎসা, সংকট, এবং শোকপর্ব—এই সময়েই জাইমাকে জনপরিসরে বেশি দেখা যাচ্ছে। শোক-অনুষ্ঠান, জানাজা এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানসহ দাফনপর্বে বিপুল জনসমাগম ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি জিয়া পরিবারের “রাজনৈতিক প্রতীকি মূল্য” নতুন করে সামনে এনেছে।
পর্যবেক্ষক মহলের পর্যবেক্ষণ:
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জাইমার উপস্থিতি কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়—এটা রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল কিন্তু কার্যকর পর্ব: “শোক” যখন রাষ্ট্রীয় ও দলীয় আবেগের কেন্দ্র, তখন পরিবারের নতুন মুখ স্বাভাবিকভাবেই জনচর্চার অংশ হয়ে ওঠে।
৩) তারেক রহমানের ‘অঘোষিত স্ট্র্যাটেজি’—জাইমা কেন “প্রতিনিধি” হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন?
জাইমা রহমানকে প্রথম বড় আকারে যে ঘটনা আলোচনায় আনে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে বাবার প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান উপস্থিত থাকতে না পারায় জাইমা প্রতিনিধিত্ব করেন—এবং এটিকে “প্রথম উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক উপস্থিতি” হিসেবে দেখা হয়।
এখানে কৌশলটা কী? (স্ট্র্যাটেজি এনালাইসিস)
ঘোষণা না দিয়েও রাজনীতিতে কাউকে ‘এন্ট্রি’ করানোর তিনটি ধাপ থাকে—
ভিজিবিলিটি: আন্তর্জাতিক/উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্মে পরিচিতি
লেজিটিমেসি: দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ (কম ঝুঁকির ফরম্যাটে)
ইনস্টিটিউশনালাইজেশন: ভোটার তালিকা, সংগঠন, পদ, বা নির্বাচন
জাইমার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপটি প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট দিয়ে শুরু হয়েছে বলে গণমাধ্যম বিশ্লেষণ করে।
৪) দলীয় কাজে ‘প্রথম বক্তব্য’: প্রবাসী ভোট সভা—ঝুঁকি কম, সিগন্যাল বেশি
নভেম্বর ২০২৫–এ বিএনপির একটি ভার্চুয়াল সভায় জাইমার অংশগ্রহণ এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়; সংবাদমাধ্যম এটিকে তার “প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য/অংশগ্রহণ” হিসেবে রিপোর্ট করে।
পর্যবেক্ষক মহলের পর্যবেক্ষণ:
এটা ছিল অত্যন্ত কৌশলী ফরম্যাট—
মঞ্চ, মিছিল, মাঠ নয়; ভার্চুয়াল
দীর্ঘ ভাষণ নয়; সংক্ষিপ্ত ধন্যবাদ ও সমন্বয়
বার্তা ছিল “কেন্দ্রীয়ভাবে দেখি”—অর্থাৎ, সমন্বয়ক মাইন্ডসেট
এভাবে রাজনৈতিক ‘টোন’ সেট করা হয়—যেখানে তিনি একজন সংগঠক/ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকায় স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে যান।
৫) খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ ও কূটনীতি: “ফ্যামিলি” থেকে “পলিটিক্যাল স্পেস”
খালেদা জিয়ার জানাজা/দাফনকে ঘিরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের ঢাকায় উপস্থিতি এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ সংবাদমাধ্যমে আসে—এবং এটিকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
পর্যবেক্ষক মহলের পর্যবেক্ষণ:
এই ধরনের সাক্ষাতে পরিবারের কাউকে পাশে দেখা গেলে সেটি “পরিচিতি”র একটি দ্রুততম সড়ক। কারণ—
কূটনৈতিক ফ্রেমে উপস্থিতি মানে “রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব”র কাছাকাছি থাকা
দলীয় রাজনীতি ছাড়িয়ে “আঞ্চলিক রাজনীতি”র আলোচনায় নাম উঠে আসা
৬) কবরস্থানে মোনাজাত: প্রতীকি রাজনীতির সবচেয়ে শক্ত ছবি
খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করার কথা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে।
এ ছাড়া তারেক রহমানের দীর্ঘদিন পর পিতার কবর জিয়ার উদ্যানে গিয়ে শ্রদ্ধা/দোয়া করার ঘটনা দেশীয় সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়—এ ধরনের অনুষ্ঠান পরিবারকে আবার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড় করায়।
পর্যবেক্ষক মোহনের পর্যবেক্ষণ:
কবরস্থানে মোনাজাত—বাংলাদেশের রাজনীতিতে “উত্তরাধিকার” ভাষার সবচেয়ে শক্ত ভিজ্যুয়াল। এটি একদিকে শোক, অন্যদিকে ধারাবাহিকতা; একদিকে পরিবার, অন্যদিকে দলীয় জনসমাগম—দুইকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়।
মিডিয়া ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাপ—
সময়/ঘটনা ক্রম— শিরোনাম-থিম– মিডিয়ার ফোকাস— প্রভাব
ডিসে ২৫–২৭ — “তারেক ফিরছেন / সঙ্গে জাইমা”– প্রত্যাবর্তন + নতুন মুখ — জাইমার নাম আলাদা করে প্রতিষ্ঠা।
ডিসে ৩০–জানু ১– “খালেদা জিয়ার মৃত্যু / রাষ্ট্রীয় জানাজা-দাফন”– শোক + রাষ্ট্রীয়তা– পরিবারকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রতীক বানায়।
জানু ১–২ — “জয়শঙ্কর ঢাকায় / তারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ”– কূটনীতি + সমবেদনা– বিএনপির আন্তর্জাতিক ফ্রেমে উপস্থিতি
“জাইমা প্রথম দলীয় সভায়” — ভার্চুয়াল সভা/ভাইরাল ক্লিপ — ‘সমন্বয়ক’ ইমেজ নির্মাণ ‘
“ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে জাইমা” — আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব- রাজনীতিতে ‘এন্ট্রি-পয়েন্ট’ হিসেবে আলোচিত।
শেষ কথা:
এ“অনিবার্য দাবি”—কিন্তু কোন পথে?
জাইমা রহমানের রাজনীতিতে অভিষেককে যদি “সময়의 দাবি” বলা হয়, তাহলে সেই সময় কাজ করছে তিনটি শক্ত কারণে:
শূন্যতা ও ধারাবাহিকতার বাস্তবতা: খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্ব-চিত্র আরও স্পষ্ট ও কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
কৌশলী প্রস্তুতি: আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি → দলীয় ভার্চুয়াল বক্তব্য → শোকপর্বে উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি—এটি ধাপে ধাপে রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি করেছে।
প্রতীকি রাজনীতির শক্তি: জানাজা, রাষ্ট্রীয় সম্মান, কবরস্থানে দোয়া—এসব ছবি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে উত্তরাধিকারকে দ্রুত সামাজিক স্বীকৃতি দেয়।
জনমত প্রতিক্রিয়া:
জাইমা রহমানের “রাজনীতিতে আসা” এখন আর কেবল জল্পনা নয়—এটি একটি পরিকল্পিত দৃশ্যমানতা। তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য রুট হলো—প্রথমে সংগঠক/সমন্বয়ক, তারপর দলীয় পদ, এবং সর্বশেষ ধাপে (পরিস্থিতি অনুকূলে হলে) নির্বাচনী ভূমিকা। কারণ এই পথটাই ঝুঁকি কমিয়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়—এবং জাইমাকে “উত্তরাধিকার” তকমা থেকে ধীরে ধীরে “নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়”-এ নিয়ে আসে।